কার্নিভাল গ্লোরী : চতুর্থ রজনী

প্রায় তিন দিন একনাগাড়ে সমুদ্র যাত্রার পর হন্ডুরাসের বুকে স্থল ভুমি তে পা রাখলাম। এখানে হন্ডুরাস সম্বন্ধে সামান্য দু-চার কথা না বললেই নয়। কলম্বাস ১৫০২ সনে এ দেশে আসেন। হন্ডুরাস এবং আরো তিনটি দেশ মিলে ১৮২১ সনে স্পেনের থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের সূচনা করে। ১৮২৩ সনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গ ত্যাগ করে একক ভাবে আমেরিকান সংযুক্ত রাজ্য হিসেবে গণ্য হয়। পরবর্তী কালে ১৮৩৮ সনে স্বশাসিত পূর্ণ স্বাধীন গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নির্বাচন করে আসছে।হন্ডুরাসের পশ্চিমে গুয়েতেমালা এবং এল সালভাদর, দক্ষিণ এবং পূর্বে নিকারাগুয়া এবং উত্তরে রয়েছে ক্যারিবিয়ান সমুদ্র।

এ তো গেল "কিছু শুস্কং কাষ্ঠং তথ্য।" কিন্তু তারও অনেক অনেক আগে সম্ভবত দশম বা একাদশ শতকে এখানে মায়ান সভ্যতার হদিস পাওয়া যায়। তবে খুবই দুঃখজনক ব্যাপার হলো পাহাড়, সুন্দর সমুদ্র তটে ঘেরা এ দেশের দারিদ্র, অপরাধ প্রবনতা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশী। এ দেশে ধূমপান সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল দুইহাজার এগারো সনে।

সকালে ত্রিয়ানা , মামটু ওদের বাবা মায়ের সঙ্গে আগে ভাগেই রওয়ানা হয়ে গেল , যেহেতু ওদের গন্তব্য ভিন্ন জায়গায়, অর্থাৎ 'স্নরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং' এর জন্য নির্ধারিত বিশেষ স্থান। আমি আর অনু ঘন্টাখানেক পরে বেরোলাম আমাদের যে গন্তব্যে যেতে হবে তার উদ্দেশ্যে।

পোর্ট মোহগানী  তে পৌঁছে  পেয়ে গেলাম "গ্লাস বটম্ ট্যুর" কম্পানীর এ সি মিনি বাস সঙ্গে গাইড ; মিনিট কুড়ি পরে পৌঁছে গেলাম ঐ কম্পানীর নিজস্ব ষ্টীমার ঘাটায়। একটু অবাকই হলাম দেখে যে আমাদের যাত্রা শুরুর আগে আমাদের গাইড মেয়েটি চোখ বুজে প্রার্থনা করতে শুরু করলো আমরা যাতে সুষ্ঠুভাবে যাত্রা শেষে সুস্থ দেহে ফিরে আসি। প্রার্থনা শেষে সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন 'আমেন'! পরে বুঝেছিলাম মেয়েটির আন্তরিক প্রার্থনার রহস্য।

মাঝারি আকারের একটি ষ্টীমার; বৈশিষ্ট্য হলো,  ষ্টীমারের দুদিকে দুটি বড়  এক আসনের "রো। "  প্রতিটি সিটের পাশেই  বেশ বড়ো সড়ো কাঁচের জানালা ,আমাদের বসতে হবে জানালার দিকে মুখ করে।বেশ কায়দা -টায়দা করে জমিয়ে বসা গেল। "গ্লাস বটম্" চলতে শুরু করার অল্পক্ষণের মধ্যেই ব্যপার টা যেন মর্মে পশিল! জানালার বাইরে জল আমাদের মাথার উপরে। আমরা জলের মধ্য দিয়ে চলেছি।

প্রথমে দেখা গেল জলের তলায় যত রাজ্যের জলজ্ উদ্ভিদ, টুকরো টাকরা ঝিনুক, শামুক। এখানেও গাইড ছিলেন , তাঁকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বললেন, এই তো সামনেই মাছ দেখবেন। তাঁর মুখের কথা শেষ হতে না হতেই জলের তলার অপার রহস্যের দুনিয়ায় প্রবেশ করলাম। ঝাঁকে ঝাঁকে  বিভিন্ন প্রজাতির মাছ , কোরাল আর সতাব্দী কাল ধরে পড়ে থাকা কত সব অজানা প্রস্তর জাতীয় বস্তু। আমার জানালার পাশে পাশে অনেকক্ষণ ধরে এক মাছ বাবাজীবন খেলা করে গেল। আমরা যেমন ওদের দেখতে গিয়েছি, ওরাও বোধকরি আমাদের জরিপ করছিল।একটা সময়  অনুভব করা গেল, ওপরে উঠছি; শেষ হলো এক অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা লাভের পর্ব। পরবর্তী দ্রষ্টব্য স্থান নির্ধারিত ছিল, "কোকোনাট গার্ডেন"! আপন মনে একটু হেসে নেওয়া গেল। ভারতের মানুষ যাচ্ছে 'নারকেল বাগান ' দেখতে।

যাই হোক, আজকের মতো ভ্রমণ পর্বের এখানেই ইতি। মন চলো জাহাজের খোলে। কথা ছিল জাহাজ ছাড়বে পাঁচটা পঁয়ত্রিশ এ। নির্ধারিত সময়ে জাহাজ ধীর লয়ে চলা শুরু করলো। আগামীকাল নুতন এক দেশ,  তার নাম বেলিজ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *