কার্নিভাল গ্লোরী : অদ্য পঞ্চম রজনী

সকাল টা শুরু হলো বাড়াবাড়ি রকমের তাড়াহুড়ার মধ্য দিয়ে।পুত্র আমার তার প্রয়াত দাদামশাই এর ন্যায় মিলিটারি অফিসারের স্বভাব পেয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে। এক কালে আমায় শ্বশুর বাড়িতে রাত্রিবাস করলে ভোর পাঁচটার সময় বেরোতে হতো। শ্বশুর মশাই কে সাড়ে চারটেয় ডেকে দিতে বললে উনি অবশ্যই এক ঘণ্টা আগে সাড়ে তিনটের সময় ডেকে দিতেন!পরে আমার মোটা মাথায় বুদ্ধি খেলে গেছিল। আমি পরের দিকে বলতাম আমায় উনি যেন আমায় সাড়ে পাঁচটায় ডেকে দেন। ফলে, আমার কাঙ্খিত সময় উনি সাড়ে চারটার সময় ডেকে দিতেন! 

পুত্র আমায় সকাল আটটার মধ্যে তৈরি হয়ে নেওয়ার জন্য বলেছিল।মিনিট পনেরো দেরী হওয়ায় তেনার মহাভারত রীতিমতো অসুদ্ধ হয়ে  গিয়েছিল নিশ্চয়! আজকে জাহাজ পোর্টে উপযুক্ত জায়গা না থাকায় বেশ কিছুটা দুরে নোঙর করতে বাধ্য হয়। ফলত: আজ সারাদিন ধরে "ওয়াটার শাটল্" যাতায়াত করেছে জাহাজ এবং পোর্টের   মধ্যে।দেরীর কারণে প্রথম শাটল্ টা মিস্ করে দ্বিতীয় শাটল ধরে মিনিট কুড়ির জল-যাত্রা সেরে পৌঁছানো গেল নুতন এক সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া ডেমোক্রেটিক দ্বীপ রাষ্ট্র 'বেলিজ' এ।  এ

ক সময়ের ব্রিটিশ অধ্যুসিত দেশটির এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে পুরোনো দিনের স্মৃতিচিহ্ন। আমাদের গন্তব্য ছিল "মিউনিসিপ্যাল এয়ারপোর্টে। ওখানে আমাদের বুকিং ছিল ছোট বিমানে করে "ব্লু হোল" দর্শনে যাওয়ার। ঘন্টাখানেক অপেক্ষার পর এলো আমাদের পালা। পনের আসন বিশিষ্ট ছোট্টো প্লেন টি যথা সময়ে আকাশে উড়লো দশ জন যাত্রী নিয়ে। অমন ভদ্র 'হাসমুখ' পাইলট দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

এ যাত্রার যথোপযুক্ত বর্ণনা দিই তেমন ক্ষমতা আমার নেই। চেষ্টা টুকু করতে পারি, তার বেশি আশা আমি নিজেও করি না।ওপর থেকে দেখা সমুদ্র তার সমস্ত রং, রূপ, তার যাবতীয় নৈসর্গিক দৃশ্যাবলী দিয়ে আমাদের নয়নের সম্মুখীন! অপেক্ষা শুধু মাত্র আমাদের তৃষ্ণা মেটানোর। কত যে রঙের বাহার, কত না অজানার আহ্বান। মাঝে মাঝে দেখা গেল অসংখ্য দ্বীপ সৃষ্টির উল্লাসে মেতে রয়েছে। হয়তো বা আগামী কোন প্রজন্মের বংশধরদের  কেউ না কেউ আসবে সেই সব দ্বীপ ভ্রমণে! মোটামুটি মিনিট কুড়ি যাত্রার পর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সমুদ্রের বুকের মাঝে যেন কয়েক মাইল ব্যাসার্ধের এক সুগোল ঘন নীল বর্ণের  এক পুস্করিনী। পাইলট সাহেব যতটা নীচে নামা সম্ভব নেমে "ব্লু হোল" কয়েক বার চক্বর দিলেন, যাতে আমরা উভয় সাইডের জানালা দিয়ে ঐ অনির্বচনীয় দৃশ্য প্রাণভরে , নয়ন ভরে দেখে মনের মনিকোঠায় চিরস্থায়ী স্থান করে দিতে পারি। এ সৌন্দর্য কে যেন আজীবন সযতনে লালন পালন করতে পারি।

সমাপ্তি রেখা টানার আগে আরও দু-চার কথা না কইলেই নয়।বেলিজ এ নামার পর এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি নিতে হয়েছিল। আমেরিকান ট্যুরিষ্ট দেখলে সব জায়গাতেই একটু আধটু বেশী হাঁকে, দশ মিনিটের মাত্রার জন্য পঞ্চাশ ডলার (ওঁদের হিসেবে একশো ডলার) আমি কলকাত্তাইয়া মধ্যবিত্ত, একটু দরদাম না করলে ভাত হজম হয় না; অতএব বলে ফেললাম তিরিশ ডলার, হাসি মুখে রাজী হয়ে গেলেন । এয়ারপোর্টে পৌঁছে আবার কতৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ফেরার সময় জেনে নিয়ে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আসবেন বলে চলে গেলেন। ফেরার পথে আমার কিছু ওষুধ কেনার ছিল; আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে  আমার কাঙ্খিত ওষুধ  কিনিয়ে দিলেন।আসা যাওয়ার পথে সারাক্ষণ ধরে প্রসিক্ষিত গাইডের মতো করে সব কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।এত সুন্দর ব্যবহার বহু দিন মনে থাকবে। "ব্লু হোল" দেখে ফেরার পর পাইলট সাহেব কে নিয়ে আমি ছবি তুলতে চাওয়ায় হাসি মুখে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। পূজা কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ কিছু অর্থমূল্য দিলে পর ধন্যবাদ জানিয়ে হাসিমুখে গ্ৰহণ করলেন। না কোনো ইগো সমস্যা বা আমাদের লবজে 'গ্যাদা' ছিল না। পরিশেষে বলি, এই "গ্ৰেট  ব্লু হোল" দেখানোর সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা পূজা করেছে, তার জন্য আবার শ্বশুর মশাইয়ের কৃতজ্ঞতা জ্ঞ্যাপন করাটা 'প্রোটোকল' বিরোধি হয়ে যাবে না তো!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *